সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি: সিরাজগঞ্জ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রিপ্রেইট মিটার প্রকল্পে সিস্টেম লসের আড়ালে চলছে বিদ্যুৎ চুরির মহোৎসব। সুষ্ঠু মনিটরিং ও চুরিবিরোধী অভিযান অব্যাহত না থাকায় কতিপয় অসাধু প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ানদের কারণে এ ধরণের বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সদর উপজেলার মালশাপাড়া, মিরপুর, পাইকপাড়া, রামগাঁতী, বনবাড়িয়া, কান্দাপাড়া, রায়পুর, শিয়ালকোল, দিয়ার বৈদ্যনাথ, কাজিপুর মোড়, ভাসানী মোড়, রহমতগঞ্জ, নতুন ভাঙাবাড়ি, আমলাপাড়া, একডালা, গয়লা ও ধানবান্ধিসহ পৌরএলাকার বেশ কিছু সংখ্যক চারকোল, টুইস্টিং, বয়লার ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন (এইচটি) মিল কারখানার প্রিপেইট বিদ্যুতের মিটার টেম্পারিং করে এ ধরণের চুরি চলছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, সরবরাহ কেন্দ্র ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুৎ চুরির কারণে গত ২ বছরে সিস্টেম লস ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে সর্বোচ্চ সাড়ে ১৯ এ দাঁড়িয়েছে। সরকারীভাবে সিস্টেম লস সাড়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত মেনে নেয়া হলেও সিরাজগঞ্জে কোন ভাবেই তা কার্যকরী হচ্ছে না। গত ২ বছরে সিস্টেম লসের নামে প্রায় ২ কোটি টাকার বিদ্যুত চুরি হয়েছে। প্রিপেইট বৈদ্যুতিক মিটারগুলোর বেশীরভাগই ফ্যাক্টরী ও মিল কারখানার ভেতরে স্থাপিত হওয়ায় খুব সহজেই এগুলোর নিউট্রল ফেল করে টেম্পারিং করা হচ্ছে। সুষ্ঠ মনিটরিং না থাকায় মিটারের বৈদ্যুতিক তার বাইপাস করে রিডিং বন্ধ রেখে অনেক অসাধু গ্রাহক ইচ্ছেমত বিদ্যুৎ চুরি করছে। মাসিক চুক্তিতে স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসের বেশ কিছু দুর্নীতিবাজ লোকজন জড়িত থাকায় এ ধরনের চুরি ধরা পড়ছে না। চুরি রোধ করতে না পারায় সিস্টেম লস গত দু’বছর থেকে ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিটার টেম্পারিং, নিউট্রল ফেল, বৈদ্যুতিক তার বাইপাস ও অবৈধভাবে মিটারের রিডিং বন্ধ রেখে বিদ্যুৎ চুরির অপরাধে চলতি বছরের মে ও জুন মাসে পৌরএলাকার মিরপুর মহল্ল্লার চারকোল মিল মালিক আব্দুল কাদের (গ্রাহক হিসাব নম্বর ৪০৮/সি) ১ লাখ ৭ হাজার টাকা, মুনসুর আলী (গ্রাহক হিসাব নম্বর ১২১০/সি) ৫০ হাজার টাকা, নাসির উদ্দিন (গ্রাহক হিসাব নম্বর ১১৩৪) ও মকবুল হোসেন (গ্রাহক হিসাব নম্বর ১০৭৪/সি) দু’জন মিলে ৫৪ হাজার টাকা, রাজু আহমেদ (গ্রাহক হিসাব নম্বর ১০৮৯/সি ও ১০২৪/সি), ৯৯ হাজার ৮২৭ টাকা, সয়াধানগড়া মহল্ল্লার আবুল হোসেন (গ্রাহক হিসাব নম্বর ১০৭০) ৩৮ হাজার ২০৪ টাকা, রামগাঁতী গ্রামের গোলজার হোসেন (গ্রাহক হিসাব নম্বর ১১৩৬/সি) ৬৯ হাজার ৯৯৬ টাকা, আব্দুস সামাদ (গ্রাহক হিসাব নম্বর ১০৭৩/সি) ৫০ হাজার টাকা, আব্দুল আউয়াল (গ্রাহক হিসাব নম্বর ১২১১/সি), ২৬ হাজার ১৯৫ টাকা, কান্দাপাড়া মহল্ল্লার বয়লার ব্যবসায়ী মোঃ আতিকুল ইসলাম (গ্রাহক হিসাব নম্বর ১১০০/সি) ৪০ হাজার ২৭৩ টাকা এবং কাজীপুর মোড়ের এইচটি গ্রাহক বিসমিল্ল্লাহ আলামিন ময়দার মিলের মালিক (গ্রাহক হিসাব নম্বর ১০৭৩/সি) ১ লাখ ১২ হাজার ৭৩২ টাকা জরিমানা বর্তমান আবাসিক প্রকৌশলী আদায় করেছেন। তবে জরিমানা দেবার পর এসব গ্রাহকরা আক্ষেপ করে বলেন, ‘সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে জরিমানা আদায় করা হলেও যাদের কারণে আমরা এ ধরণের কাজ করার সুযোগ পেলাম নির্বাহী প্রকৌশলী তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেননি।’ প্রিপেমেন্ট সার্ভারের ইনচার্জ উপসহকারী প্রকৌশলী নোমান আহম্মেদ বলেন, ‘ব্যবহৃত বিদ্যুতের ইউনিট দেখে প্রাথমিকভাবে চুরির বিষয়টি ধরার পর কর্মকর্তাদের সঠিক সময়ে অবগত করা হয় ঠিকই, কিন’ পরে কেউই ব্যবস্থা নেন না।’ সার্ভারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এবিএম হামিদুর রহমান বলেন, ‘চুরি হচ্ছে জেনেও অপ্রতুল জনবলের কারণে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারি না। অনেক সময় আবাসিক ও নির্বাহী প্রকৌশলীদের অনিয়মের কারণে সিস্টেম লস বেড়ে যায়। সরকারীভাবে সংযোগ বন্ধ থাকা সত্ত্ব্বেও পূর্ববর্তী নির্বাহী প্রকৌশলী শামছুল হক গতবছর অবৈধভাবে বেশকিছু সংযোগ দিয়ে সিস্টেম লস বাড়িয়ে দিয়েছেন।’ সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী শামছুল হক মোবাইলে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি চলে আসার সময় সিস্টেম লস ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ ছিল, অথচ এখন তা ১৯ শতাংশে পৌঁছেছে। আমি থাকা অবস্থায় সহকারী প্রকৌশলী এবিএম হামিদুর রহমানের বেশ কিছু দুর্নীতির কারণে তার এসিআর আটকে রাখা হয়। পরবর্তীতে সে ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পেয়ে আর্থিক সুবিধা নিয়ে সোলার সিস্টেম নিশ্চিত না করেই ৪/৫টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মিল কারখানার বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েছে বলে আমার কাছে সুস্পষ্ট তথ্য রয়েছে। শুধু তাই নয়, গতমাসে মোনা স্টিল মিলের ব্যবহৃত প্রায় দেড় লাখ ইউনিট পরিমাণ বিদ্যুত বিল না করেই বিশেষ উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে হাতে জমা রেখেছে। একজন শিক্ষকের ছেলে হয়ে মাত্র ২ বছরের চাকরীর মাথায় সে কিভাবে প্রাইভেট করের মালিক হলো। অথচ আমরা ২০ বছর চাকরী করেও তা পারলাম না।’ বর্তমান আবাসিক প্রকৌশলী কৃষ্ণ কান- রায় বলেন, ‘সিস্টেম লসের নামে এখানে বড় ধরণের বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে, সেটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। গত ৪ মাস আগে এখানে যোগদানের পর বিদ্যুতের পুকুর চুরির বিষয়টি টের পেয়ে উর্ধ্বতন বরাবর প্রতিবেদনসহ অবগত করেছি। অবৈধভাবে বিদ্যুৎ চুরির দায়ে এরই মধ্যে ১০/১২টি চারকোল, বয়লার ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মিল কারখানার মালিকদেরকে প্রায় ৮ লাখ টাকা জরিমানা করেছি। আর এ কারণে গত ৪ মাস হলো মাসিক প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার সমপরিমাণ বিদ্যুৎ চুরি হ্রাস পেয়েছে। উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হামিদুর রহমান এ ধরনের অভিযানে আমাকে তেমনটি সহযোগিতা তো করেননি, বরং তার উল্টোটা করেছে মাত্র। গতমাসে মোনা স্টিল মিলের ব্যবহৃত প্রায় দেড় লাখ ইউনিট পরিমাণ বিদ্যুৎ বিল না করেই হাতে জমা রেখেছে। বিষয়টি জানার পর বার বার তার কাছে এ বিষয়ে জবাব চেয়েছি, কিন’ সে সেটি জানাতে গড়িমসি করছে।’ বর্তমান ও পূর্ববতী আবাসিক ও নির্বাহী প্রকৌশলীদের অভিযোগের বিপরীতে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এবিএম হামিদ বলেন, ‘সিস্টেম লস আগেও ছিল, এখনও আছে। এসবের জন্য আমি একা দায়ী নই। দক্ষ ও প্রয়োজনীয় জনবল থাকলেই এসব সিস্টেম লস কমানো সম্ভব যা কারোর একার পক্ষে সম্ভব নয়।’ মোনা স্টিল মিলের দেড় লাখ বিদ্যুৎ ইউনিট হাতে রাখার অভিযোগের প্রেক্ষিতে বলেন, ‘এটা আর কিছুই নয় এক ধরণের ভুল বোঝাবুঝি।’ গাড়ি ক্রয়ের বিষয়ে তিনি আরো বলেন, ‘এনজিও থেকে লোন করে আমি প্রাইভেট কারটি কিনেছি।’ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মিল কারখানায় সৌর প্যানেল ছাড়াই সংযোগ প্রদানের বিষয়ে বলেন, ‘যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করেই এ সমস্যা সংযোগ দেওয়া হয়েছে।’ উল্লেখ্য, বিদ্যুৎ চুরিরোধে এ প্রকল্পের আওতায় সিরাজগঞ্জ পৌরএলাকা ও শহরতলীতে ২০০৫ সালে স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিস থেকে প্রিপেমেন্ট মিটার সংযোগ দেয়া হয়। এ পর্যন্ত এখানে এ ধরণের ৩০ হাজার গ্রাহক রয়েছে। এর মধ্যে ৩২৯টি চারকোল, বয়লার, টুইস্টিং ও অন্যান্য নিম্নক্ষমতা সম্পন্ন মিল কারখানা রয়েছে। এছাড়া সিরাজগঞ্জ জাতীয় জুট মিল ও মোনা স্টিল মিলের মত ২৮টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন (এইচটি) মিল কারখানাও রয়েছে।
Home / অর্থনীতি / সিরাজগঞ্জ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রিপেইট মিটার প্রকল্পে সিস্টেম লসের আড়ালে চলছে বিদ্যুৎ চুরির মহোৎসব
আরও পড়ুন...
নওগাঁয় এন আর বি সি ব্যাংকের ২২ তম শাখার শুভ উদ্বোধন!!
এনবিএনডেক্স: নওগাঁয় এন আর বি সি ব্যাংক (এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড) এর ২২ তম শাখা …