22 Chaitro 1431 বঙ্গাব্দ শনিবার ৫ এপ্রিল ২০২৫
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ »
Home / সারাদেশ / বিহারি ক্যাম্পে সংঘর্ষে নিহত ১০ রাজধানীর মিরপুরে আতশবাজি ফোটানোকে কেন্দ্রে করে সংঘর্ষ, ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি, উস্কানির অভিযোগ স্থানীয় এমপির বিরুদ্ধে

বিহারি ক্যাম্পে সংঘর্ষে নিহত ১০ রাজধানীর মিরপুরে আতশবাজি ফোটানোকে কেন্দ্রে করে সংঘর্ষ, ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি, উস্কানির অভিযোগ স্থানীয় এমপির বিরুদ্ধে

এনবিএন ডেক্স:  নিষিদ্ধ হলেও পবিত্র শবে বরাতের রাতে আতশবাজি ফোটানোকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মিরপুর কালশীর বিহারি ক্যাম্প এলাকায় সংঘর্ষে দুই শিশুসহ ১০ জন নিহত হয়েছেন। অবাঙালি, এলাকাবাসী ও পুলিশের সাথে ত্রি-মুখি সংঘর্ষে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের সাতজন রয়েছেন। তারা হচ্ছেন- বেবী (৪০), তার মেয়ে শাহানা (২৬), আফসানা (১৯) ও রোকসানা (১৬) এবং যমজ দুই ছেলে লালু (১৪) ও ভুলু (১৪), শাহানার ছেলে মারুফ (২)। এছাড়া নিহতদের অন্যরা হচ্ছেন- আযাদ (৩৫), বাবুল (২৯) ও আশিক (৫)। এ ঘটনায় পুলিশ সাংবাদিকসহ আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। এদের মধ্যে একজন পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় অগি্নসংযোগ করা হয়েছে দোকান ও বাসাবাড়িতে। ভাঙচুর-আগুন, লুটপাট, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল, পুলিশের টিয়ারশেল, গুলি, বিক্ষোভে গতকাল শনিবার ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত ওই এলাকায় চলছিল চরম উত্তেজনা। একপর্যায়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও সেখানে এখন শুধুই আতঙ্ক। বিরাজ করছে থমথমে অবস্থা আর ফের সংঘর্ষের আশঙ্কা। ঘটনাস্থল ঘুরে সর্বশেষ দেখা গেছে, বিহারি ক্যাম্পে কান্নার রোল, ক্ষোভ আর স্বজন হারানোর শোক। ধ্বংসাবশেষগুলোর পাশে চলছে আহাজারি। বিহারিদের নেতৃবৃন্দ দাবি করেছেন, বিশেষ মহলের উস্কানিতে এ হামলা চালানো হয়েছে। এতে স্থানীয় এমপি ইলিয়াছ উদ্দিন মোল্লার সম্পৃক্ততা রয়েছে। স্থানীয়রা দাবি করেছেন, বিহারি ক্যাম্পে সংঘর্ষের সময় কয়েকটি ঘরে আগুন দেয়া হলে অগি্নদগ্ধ হয়ে মারা যান নয়জন। এছাড়া দুপুর পর্যন্ত পুলিশের সাথে সংঘর্ষে নিহত হন একজন। ঢাকার জেলা প্রশাসক জানান, নিহতদের দাফনের জন্য প্রতি পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনেরও ব্যবস্থা করা হবে। সামগ্রিক প্রতিবেদন তৈরি করে তা প্রধানমন্ত্রীকে দেয়া হবে বলেও জানান তিনি। এদিকে নিহতদের লাশ এবং চিকিৎসাধীনদের দেখতে গতকাল বিকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের একজন যুগ্ম কমিশনারকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এ সময় পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার, ঢাকার জেলা প্রশাসক শেখ ইউসুফ হারুন, ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া আহতদের দেখেতে বিএনপি নেতারাও হাসপাতালে গিয়েছিলেন। আহতরা ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন, শবে বরাতের রাতে বিহারি ক্যাম্পের ছেলেরা রাতভর বাজি ফোটাচ্ছিলেন। ফজরের নামাজ পড়ার জন্য স্থানীয় মুসলি্লরা মসজিদে যাওয়ার সময়ও আতশবাজি ফোটানো হলে তারা কয়েকজন বিহারি যুবককে মারধর করেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। দুপুর পর্যন্ত থেমে থেমে সংঘর্ষ চলে।
এদিকে সংঘর্ষের খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে গেলে ক্যাম্পের ভিতরে তাদের ঢুকতে বাধা দেয়া হয়। এরপর বিহারিদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় পুলিশ টিয়ারশেল ও গুলি চালায়। শত শত বিহারি নারী-পুরুষ পুলিশকে নানাভাবে আক্রমণ করেন। গতকাল ভোরে ঘটনা স্থলে গিয়ে দেখা যায়, ক্যাম্পের ভিতরের স্ট্যান্ডেড পাকিস্তানিজ জেনারেল রিপেট্রিয়েশন কমিটির কার্যালয়ে লাশ রাখা থাকলেও সেখানে পুলিশ-সাংবাদিক কাউকেই ঢুকতে দেয়া হচ্ছিল না। একপর্যায়ে সাংবাদিকরা বিচ্ছিন্নভাবে ভিতরে প্রবেশ করলেও লাশ রাখার স্থান পর্যন্ত যাওয়া যাচ্ছিল না। অন্যদিকে থেমে থেমে চলছিল সংঘর্ষ। শত শত বিহারি নারী পুরুষ মৃতদেহগুলো ঘিরে রেখেছিল। গুম হওয়ার আশঙ্কায় লাশগুলো হস্তান্তর করতে চাচ্ছিলেন না বিহারিরা। যে কারণে বাধার মুখে পুলিশ কিংবা প্রশাসন চেষ্টা করেও সেখানে পৌঁছতে পারছিলেন না। এ অবস্থার মধ্যে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিহারিদের পক্ষ থেকে মাইকিং করে ঘটনাস্থলে থাকা সাংবাদিকদের প্রকৃত সত্য তুলে ধরার আহ্বান জানানো হয়। এ সময় সেখানে ৯টি লাশ রয়েছে এবং পুলিশের গুলিতে আহত আযাদ ঢাকা মেডিকেলে মারা গেছেন বলে মাইকে জানানো হয়। এ সময়ও তারা লাশ গুম হওয়ার আশঙ্কার কথা জানান। এদিকে দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা জেলা প্রশাসক লাশের কাছাকাছি যেতে পারলেও বিহারিদের প্রবল বাধার মুখে তাকে সেখান থেকে সরে আসতে হয়। জেলা প্রশাসক সেখানে গিয়ে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করেন। পরে তিনি হ্যান্ডমাইকে লাশ ফিরিয়ে দিয়ে প্রশাসনিক কাজ করতে দেয়ার আহ্বান জানালে বিহারিরা তার বিরদ্ধে সেস্নাগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে জেলা প্রশাসক তার বক্তব্য বন্ধ করে দেন। দুপুরের দিকে পুলিশ বিহারি ক্যাম্প ও তার আশপাশে অভিযান শুরু করে। কিন্তু লাশ ঘিরে ব্যাপক বিহারি নারী-পুরষ অবস্থান নেয়ায় এবং বাধার মুখে সেখানে যেতে পারছিল না পুলিশ। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে মিরপুর ডিওএইচএস এর পাশের রাস্তা থেকে কয়েকজন বিহারি যুবককে একসাথে ধরে প্রিজন ভ্যানে উঠিয়ে নেয়া হয়।
এছাড়াও ক্যাম্পের ভিতর থেকে বিচ্ছিন্নভাবে আরও কয়েকজনকে আটক করা হয়। দুপুরের পর ঢাকার জেলা প্রশাসক শেখ ইউসুফ হারুন যাওয়ার পর লাশ দিতে সম্মত হয় ক্যাম্পবাসীরা। পরে সেখান থেকে ওই ৯টি লাশ নিয়ে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে বিকাল ৪টার দিকে পুলিশের পিকআপে (ঢাকা মেট্রো-ন-১৬১৩৪৪) ‘পুলিশ’ লেখা ৯টি পৃথক বস্তায় প্যাকিং করা অবস্থায় মৃতদেহগুলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে নিয়ে আসা হয়। বিকাল সাড়ে চারটার দিকে ওই ৯টি লাশ ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছে। জেলা প্রশাসক ইউসুফ হারুন সাংবাদিকদের জানান, নিহত ১০ জনের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ময়না তদন্ত শেষে তা ফের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এরপর তাদের দাফন-কাফন সম্পন্ন হবে। দাফনের জন্য প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে সহযোগিতা দেয়া হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনেরও আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক। ডিএমপির মিরপুর জোনের ডিসি ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, শবে বরাত উপলক্ষে এক পক্ষ অন্য পক্ষের বাসার সামনে গিয়ে আতশবাজি ফোটায়। একে কেন্দ্র করেই দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ পুরো এলাকা ঘিরে রাখে। সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন পুলিশ সদস্যও আহত হন। আযাদ নামের ওই ব্যক্তি পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন কি না-জানতে চাইলে তিনি জানান, সংঘর্ষের সময় এলাকাবাসীও পুলিশকে লক্ষ্য করে সশস্ত্র হামলা চালিয়েছিল। তারাও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছিল। তাই কাদের গুলিতে তার মৃত্যু হয়েছে, তা এখনি বলা যাচ্ছে না। ঢাকা মেডিকেলে থাকা আযাদের মৃতদেহে ছররা গুলির চিহ্ন রয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের দাবি, বিহারি ক্যাম্পের অল্পবয়স্ক ছেলেরা আতশবাজি ফোটাচ্ছিল। ফজরের নামাজ শেষ হওয়ার আগেই কয়েকজন মুসলি্ল ঘটনাস্থলে এসে তাদের মারধর শুরু করেন। এরপর ঘটনাস্থলে পুলিশ এসে গুলি চালায়। এ সময় বিহারি ক্যাম্পের ভিতরে কয়েকটি ঘরে আগুন দিয়েছে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা। আগুনে দগ্ধ হয়ে একই পরিবারের সাতজনসহ নয়জন নিহত হয়েছেন। বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দা শমশেরের দাবি, পুলিশের সাথে যোগ দিয়ে স্থানীয় বাঙালিরা বিহারিদের সাথে সংঘর্ষে জড়ায়। একপর্যায়ে বিহারিদের কয়েকটি ঘরে পেট্রোল ঢেলে ঢেলে আগুন দেয়া হয়। আদিল আহমেদ দাবি করেন, বাইর থেকে তালা লাগিয়ে বেশ কয়েকটি ঘরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয়া হয়েছে। এ সময় লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে। অন্যদিকে প্রাণহানির খবরে বিহারিরা আরও উত্তেজিত হয়ে পড়ে। ক্যাম্পের ভিতর থেকে শত শত নারী-পুরুষ রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন। পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়ান। ভোর থেকে পুলিশের সাথে বিহারিদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পুরো এলাকা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও ফাঁকা গুলি ছোড়ে পুলিশ।
মিরপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার কামাল জানান, আতশবাজি পোড়ানোসহ সংঘর্ষে জড়িত থাকার অভিযোগে তারা ৬৬ জনকে আটক করা হয়েছে। ঘটনার পর মোহাম্মদপুরসহ অন্যান্য স্থানে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। অন্যদিকে জেলা প্রশাসক ইউসুফ হারুন লাশ হস্তান্তরের সময় ক্যাম্পবাসীকে আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘আটক ব্যক্তিদের ছাড়িয়ে আনার পদক্ষেপ নেয়া হবে। ঘটনার সামগ্রিক প্রতিবেদন তৈরি করে তা প্রধানমন্ত্রীকে দেয়া হবে।’ এদিকে সংঘর্ষের পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলো বিদ্যুৎ ও পানি সংকটে পড়েছে। সংঘর্ষের সময় দুর্বৃত্তরা ক্যাম্পের বিদ্যুৎ লাইন কেটে দেয়। ফলে ক্যাম্প বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অপরদিকে ক্যাম্পে পানি সরবরাহের জন্য মুসলিম এইড থেকে স্থাপন করা পানির ট্যাংকগুলোও ভেঙে ফেলে দুর্বৃত্তরা। পরে তারা সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে বিহারি ক্যাম্পে দেখা দিয়েছে তীব্র পানি সংকট। চরম দুর্ভোগে পড়েছে ক্যাম্পবাসী।
যা বলছেন বিহারি নেতারা
শনিবার দুপুরে ওয়েলফেয়ার মিশন অব বিহারির চেয়ারম্যান ও অবাঙালিদের সংগঠন ইউসিবিএস’র প্রধান উপদেষ্টা মোস্তাক আহমেদ কুর্মিটোলা ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায় সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, বিহারিদের জন্য বরাদ্দকৃত জমি অবৈধভাবে দখলের চেষ্টাকে সামনে রেখে উস্কানি দিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে একটি বিশেষ মহল। এই বিশেষ মহলকে সরাসরি সহযোগিতা করেছেন স্থানীয় এক প্রভাবশালী রাজনীতিক। মোস্তাক আহমেদ বলেন, প্রতিবছর একসাথে বাঙালি ও অবাঙালি শবে বরাত উদযাপন করে আসছে। কখনো আতশবাজি পোড়ানো বা অন্য কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধ বাধেনি। তিনি বলেন, একটি দু’টি নয়, দশটি ঘরে আগুন দিলেও দশজন মানুষ পুড়ে মরার কথা নয়। তিনটি পরিবারের তিনটি ঘরে তালাবদ্ধ করে পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনা ঘটায় বিশেষ মহলটি। বিহারিদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্য প্রভাবশালীদের লেলিয়ে দেয়া ওই চক্রটি পরিকল্পিতভাবে আতশবাজি পোড়ানোর পরিকল্পনা সাজায়। এরপর ফজরের নামাজ শেষে মানুষ ঘুমিয়ে পড়ার পর পরিকল্পিকতভাবে এ ঘটনা ঘটায়। তিনি বিহারি ক্যাম্পের এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন।

আরও পড়ুন...

বিএনপি জনগণের দল, জনগণই বিএনপির শক্তি

নওগাঁ প্রতিনিধি: আব্দুস সালাম বলেন, ‘বিএনপি জনগণের দল। জনগণই বিএনপির শক্তি। আওয়ামী লীগও অনেক বড় …